হত্যা না করেও হত্যা মামলার আসামি, হলেন আটক

সমগ্র বাংলা

শরিয়াতপুর প্রতিনিধিঃ

একটি হত্যান্ডকে পুঁজি করে চলছে হামলা ও লুটপাট। ঘটনার প্রায় ১৬ দিন পর হলেও এখনো এলাকা থমথমে। চলছে এক প্রকার অরাজাকতা। ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হয়েও গণহারে মামলার আসামি করা হয়েছে। আসামি হওয়ার কারণে পুরুষ লোকরা ঢা ঢাকা দিয়েছে। এ সুযোগে প্রতিপক্ষের লোকজন একের পর বাসা বাড়িতে হামলা করে ভাঙ্কচুর চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ওই সকল বাসা বাড়িতে চালানো হচ্ছে লুটপাটও। এতে করে এলাকায় নজিরবিহীন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যে কোন মুহুর্তে আবারো সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটেছে শরিয়তপুর জেলার পালং থানার চিতলিয়ার মজুমদারকান্দি গ্রামে। তবে পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাড়তি নজরদারীও চালানো হচ্ছে।

জানা যায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ৩ মে ঈদের দিন সকালে নামাজের সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কুদ্দুস ব্যাপারী গুরুতর আহত হন। পরে তাকে জরুরীভাবে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় পরের দিন ৪ মে নিহত কুদ্দুস ব্যাপারীর ছেলে লিটন ব্যাপারি বাদি হয়ে পালং থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় লিটন ব্যাপারি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হারুন হাওলাদারের ছেলে সোহান হাওলাদারকে প্রধান আসামি করে ৬৫ জনের নাম উল্লেখ করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মামলার পর থেকেই এলাকায় এক প্রকার থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মামলার কারণে অনেকেই এলাকা ছাড়া হয়ে যান। আর এ সুযোগে সোহান হাওলাদারসহ মামলার অন্যান্য আসামি হিসেবে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের বাড়িঘরে শুরু হয় হামলা, ভাঙ্কচুর ও লুটপাট। গত ১৬ দিনেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের অরাজাকতা চলছে। পুরুষশুন্য বাড়িতে মহিলাদেরকেও নির্যাতন করা হচ্ছে। প্রকাশ্যই বাসা-বাড়িতে ঢুকে চালানো হচ্ছে লুটপাট।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চিতলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম হাওলাদার ও চিতলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মাস্টার হারুন অর রশিদ হাওলাদারের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দুই ভাগে বিভক্ত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ। কুদ্দুস বেপারী নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভয়ে হারুন হাওলাদারের সমর্থকদের মধ্যে কয়েকটি গ্রাম পুরুষ শূন্য হয়ে পড়ে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এই সুযোগে হারুন হাওলাদারের সমর্থকদের বসত বাড়ি থেকে গবাদিপশু, স্বর্ণালঙ্কার, ফ্রিজ, টেলিভিশন, নগদ টাকা, আসবাবপত্র, গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার, ঢালাই মেশিন, মিকচার মেশিন, ভাইব্রেটর মেশিন, নছিমন, এমনকি ঘরের ব্যবহৃত থালাবাসন, চাল ডাল লুট করে নিয়ে গেছে সালাম হাওলাদারের সমর্থকরা। প্রায় ৪০-৫০টি বাড়িতে হামলা চালিয়ে সর্বস্ব লুট করে ট্রাক-পিকআপ ভরে নিয়ে গেছে সালাম হাওলাদারের সমর্থকরা।

চিতলিয়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ মজুমদারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন চৌকিদার বলেন, ঈদের নামাজ শেষ হতে না হতেই শুনি ইমাম হোসেন বেপারীকে প্রতিপক্ষ মারপিট করেছে। এরপর রাস্তা এসে দেখি উভয় পক্ষ মুখোমুখি। আমি প্রথমে মারামারি থামানোর চেষ্টা করি। এরপর ব্যর্থ হয়ে থানায় বার বার ফোন করে পুলিশ পাঠানোর অনুরোধ করি। ঈদের নামাজ শেষ করে পুলিশ দেখেন সংঘর্ষ থেমে গেছে। আমি মারামারি থামাতে গিয়েও হত্যা মামলার আসামি হয়েছি। আমার আরও তিন ভাই ও ভাতিজাকে আসামি করা হয়েছে। আমাদের বাড়িতে লুটপাট করে ঘরের সমস্ত জিনিপত্র নিয়ে গেছে। এখনো হুমকি ধামকি দেয়ার কারণে শত শত পুরুষ এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।

জাকির সরদারের স্ত্রী সেফালী জানান, ঈদের দিনের মারামারিকে কেন্দ্র করে আমার সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেছে সালাম হাওলাদারের লোকজন। তারা ঢাল, ছেন নিয়ে বাড়িতে হামলা চালিয়ে লুট করেছে। ভয়ে আমি টয়লেটে পালিয়ে ছিলাম।

জাহাঙ্গীর হাওলাদারের স্ত্রী রেনু জানান,পুরো বাড়ি ঘেরাও করে জালাল হাওলাদারের ছেলে জয় ঘরের ভেতর ঢুকে আমার গলায় ছেন করে বলেছে ঘরে যা আছে ভালোয় ভালোয় দিয়ে দে অন্যথায় জবাই করে দেব।

মনির সরদারের স্ত্রী মারিয়া আক্তার জানান, ফ্রিজ নিয়ে গেছে, আলমারি ভেঙে যা কিছু পাইছে সব কিছু নিয়ে গেছে। আবার বলে গেছে সন্ধ্যার পর পিকআপ নিয়ে এসে বাকি যা আছে তাও নিয়ে যাবে। গণি সরদারের ছেলে আউয়াল, জাহাঙ্গীর সরদার এরা এসে সব নিয়ে গেছে।

আতাবর রহমান সরদারের মা ছলেহা (৬০) জানান, আমার ছেলের মুদি দোকান লুট করে নিয়েছে সৈয়দ সরদার, আউয়াল সরদার, আনোয়ার সরদার, বেলায়েত মাদবর, মোশাররফ বেপারী, জালাল বেপারীর ছেলে হান্নান। জাকির সরদার (৫০), দেলোয়ার সরদার (৪৫),আনোয়ার সরদার (৩৫),লিয়াকত সরদার (৩০),হানিফ সরদার (৩৫), আক্তার সরদার (৩০),ইমান হোসেন সরদার (২৫), এনামুল সরদার,জাহাঙ্গীর হাওলাদার, দুলাল মৃধা ও আব্দুল হাইর (মেম্বার প্রার্থী ছিলেন) বাড়িঘরসহ প্রায় ১৫/২০টি বাড়িঘর লুট হয়।

ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, খালেক হাওলাদের ছেলে জসিম হাওলাদার, ওয়াসীম হাওলাদার। রাজ্জাক, আবুল,আজিজুল, বায়জিদ হাওলাদার, তাহসিন হাওলাদার, জালাল হাওলাদারের ছেলে জয়, মালেক হাওলাদারের ছেলে মাহাবুব, মাসুদ হাওলাদার, সেলিম হাওলাদারের ছেলে শাওন,আনোয়ার চৌকিদারসহ প্রায় ৫০/৬০ জন লোক এসে হারুন হাওলাদারের সমর্থকদের বাড়িঘর লুট করে গরু বাছুর, স্বর্ণালঙ্কার, ফ্রিজ, নগদ টাকাসহ গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে।

ভুক্তভোগীরা আরও বলেন তাদের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচারণায় বাঁধা দেয়া হচ্ছে।

এ মামলায় গতকাল শুক্রবার (২০.০৫.২০২২) দুপুরে রাজধানী থেকে তাকে আটক করা হয়।

এর আগে সোহান হাওলাদার বলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারনেই আমাকে প্রধান আসামি করা হয়। যেহুতু আমার বাবা চেয়ারম্যান নির্বাচনে লড়ছে তাই আমাদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে রাখার জন্য এই মিথ্যে ও বানোয়াট মামলা দেয়া হয়। সংঘর্ষের সময় আমি আঙ্গারিয়া মসজিদে নামাজ পড়ছিলাম, সেখানে থাকা সিসি টিভি ফুটেজে স্পষ্টভাবে আমাকে শনাক্ত করা যাচ্ছে, অথচ মামলায় বলা হচ্ছে আমি সশরীরে উপস্থিত থেকে তাকে (কুদ্দুস ব্যাপারী) হত্যা করেছি, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের (প্রতিপক্ষ) ফাঁসাতেই কৌশলে এই হত্যাকান্ড সংগঠিত করে থাকতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনাটি ঘটে শরীয়তপুরের মজুমদারকান্দি, তবে হামলার প্রধান আসামি ছিলেন আঙ্গারিয়া জামে মসজিদে। ঘটনা স্থলে না থেকেও তাকে হামলার প্রধান আসামি করা হয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পালং মডেল থানার ওসি আকতার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, আওয়ামী লীগ নেতা হত্যার ঘটনায় ৬৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন নিহতের ছেলে লিটন ব্যাপারী। এ মামলায় আমরা ৫ জনকে গ্রেফতার করেছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলায় নাম থাকলেও নিরাপরাধ কোন ব্যক্তি যেন হয়রানীর শিকার না হন সে ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক। আমরা সেইভাবেই মামলা তদন্ত করে চলেছি। এছাড়াও বাড়িঘরে হামলা লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব।